তোমাতে_আমাতে
লেখা আশিকা জামান
পার্ট ০৬
ইমন চলে যাবার পর বাসায় পৌছে ফোন করেছিলো। এরপর আর কথা হয়নি। আমি মাথা থেকে বিয়ের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে পড়াশোনায় মনযোগী হওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু একটু পর বুঝতে পারলাম আমার চেষ্টা ব্যার্থ। ইমন আমার মগজে ঢুকে গেছে এটাকে বের করা অসম্ভব।
পরেরদিন সকালে আমি ওকে ফোন করেছিলাম প্রথমে পিক করতে পারেনি। পরে ব্যাক করে বলেছিলো যে ও বিজি হস্পিটালে আছে পরে কথা বলবে। কিন্তু আমি সারাদিন অপেক্ষা করার পর রাতে ফোন করে বলে,
-- আদি আমি সারাদিন অনেক বিজি ছিলাম। এখন বলো কিছু বলবা?
-- নাহ, তেমন কিছু নাহ।
-- আচ্ছা তুমি পড়া শেষ করে ঘুমিয়ে যাও।আর কালকে সকাল সকাল এসো। রাখছি বাই।
আমি চুপ করে ছিলাম। কিছুই বলছিলাম নাহ। আমার সব কিছু উল্টাপাল্টা লাগছে। কেমন যেন একটা এভোয়েড এর গন্ধ আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে আলোড়িত করছে। কিন্তু আমি যে ভালবাসার মোহে অন্ধ। সবকিছুর উর্ধে থেকে যে আমি ইমনকেই ভালবাসি তাই আমি নিশ্চুপ।
-- কি হলো। কথা বলছোনা যে?
আমার কথা প্রছন্দ হয়নি। আমি সত্যিই ব্যাস্ত ছিলাম আর এখন খুব টায়ার্ড। একটা ফ্রেস ঘুম দরকার।
-- নাহ তেমন কিছু না। আপনি ঘুমান আর আমিও এখন ঘুমাবো কেমন।
আমি ফোনটা কেটে দিলাম।
সুক্ষ্ম অভিমান সারা রাত আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
সকালে মায়ের চিৎকারে আমার ঘুম ভাংগে। আমি কচলাতে কচলাতে চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকাই,
-- মা কি হয়েছে? আরেকটু ঘুমাতে দাও না।
-- এই উঠ। কোন কথা না।
বলেই মা আমার হাত ধরে টেনে তুলতে লাগলো।
-- তোর মনে নেই আজকে যে শ্বশুর বাড়ী যেতে হবে?
-- কার শ্বশুরবাড়ি, কিসের শ্বশুরবাড়ি? ধুর কি উল্টো পালটা বলছো আমারতো বিয়েই হয়নি।
ভাইয়া রুমের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলো আমার এই টাইপের কথা শুনে হাসতে হাসতে রুমে ঢুকে।
মা ও ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আবার হাসিতে ফেটে পড়ে।
ওদের হাসি আমার অসহ্য লাগছে। ধুর আমি কি এমন বলেছি যে এইভাবে হাসতে হবে।পরক্ষনেই মনে পড়ে গেল ছিঃ আমি এইটা কি বলমাম। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম।
-- ইমন যদি শুনে তুই দুইদিন যেতে না যেতেই ওকে এইভাবে ভুলে গেছিস তাহলেতো
বেচারা শেষ হয়ে যাবে।
এইটা বলে ভাইয়া আবার হাসতে লাগলো।
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
-- ওই বাড়ীতে গিয়ে আবার ভুলভাল কিছুই বলিস না। তাহলে আমরা লজ্জায় শেষ হয়ে যাবো।
আর শোন একেবারে রেডি হয়ে নিচে আসো। ব্রেকফাস্ট করেই বেরোবো ঠিক আছে। তোমার বাবা খুব আফসোস করে একদিনো তোমার সাথে ব্রেকফাস্ট করতে পারে না।
মা আর ভাইয়া চলে গেলে আমি আলমারি থেকে ড্রেস বের করতে লাগলাম। কিছুতেই প্রছন্দ করতে পারছিলাম। তারপর একটা হুয়াইট চিকেন জামা আর মেরুন চিকেন প্লাজো সাথে ব্ল্যাক কালারের ভিতর হুয়াইট, মেরুন, পার্পল কালার সুতোর কাজ করা ফুলকারী দোপাট্টা বের করলাম। এটা কেন জানি আজকে পড়তে ইচ্ছা হলো।
আমি একেবারে শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলাম। চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিলাম। কোমড় ছাড়ানো লম্বা চুলে কি স্টাইল করবো সেটাই বুঝতে পারছিলাম। আমার আবার কোন যায়গায় গেলে সবচেয়ে বেশি টাইম লাগে এই হেয়ার স্টাইল নিয়ে। পরে চুলগুলো সামনে থেকে নিয়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে পিছনের গুলো ছেড়ে দিলাম। হালকা কাজল আর লাইনার দিয়ে চোখ একে নিলাম। ঠোটে হালকা লিপিস্টিক দিয়ে নিচে নেমে এলাম।
মাকেও দেখলাম রেডি হয়ে আমার জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করছে। আমার কিছুতেই খেতে ইচ্ছে করছে না। কোন যায়গায় গেলে বরাবরের মতই আমার খেতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু মায়ের জোড়াজোড়িতে অনলি ডিম টা খেয়ে নিলাম।
ভাইয়া আর বাবা রেডি হয়ে আসলে সবাই আমাদের গাড়িতে বসে রওয়ানা হলাম।
আমাদের বাসা থেকে ওদের বাসায় আসতে বড়জোর কুড়ি মিনিটের মত লাগলো। দারোয়ান গেট খুলতেই সালাম দিয়ে ভেতরে যেতে বললো। নয় তলা বাসাটার লিফটে আমরা দোতলায় উঠলাম। ভাইয়া কলিং বেল চাপ দিতেই কিছুক্ষন পর ইমন এসে গেট খুলে দিলো। ও একটা মেরুন টি শার্ট আর অফ হুয়াইট প্যান্ট পড়েছে।
আমাদের দেখেই সালাম দিয়ে ভেতরে বসতে বললো। সামনেই ড্রইং রুম সবাই বসে পড়লো। মামনি আর বাবাই এসে সবার কুশল জিজ্ঞাস করলো। আসতে অসুবিধা হলো কিনা এটাও জিজ্ঞাস করলো। আমার ওদের বাসাটা ভালোই লাগলো।
ইমন আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-- আদি আসো তোমাকে বাসাটা ঘুরে দেখাই।
আমি ওর কথা শুনে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম।
মামনি এটা বুঝে ফেলে। আমার দিকে তাকিয়েই বলে,
-- যাও লজ্জা পেয়ো না । এটাতো তোমারই বাড়ী। আসলে তোমাকেতো এইভাবে আমি নিয়াসতে চাই নি। স্বপ্নটা অনেক বড় ছিলো আমার একমাত্র ছেলের বউ বলে কথা...
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
-- মামনি প্লিজ কষ্ট পাবেন না। আমি সত্যি হ্যাপি আপনাদের মত মা বাবা পেয়ে আমার আর কিচ্ছু চাই না।
মামনী এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
-- এইতো আমার লক্ষী মা। এবার তোমরা যাও আমরা বুড়ো বুড়িরা একটু নিজেদের মধ্যে কথা বলি।
-- উহু বুডু বুড়ী না আপনারা আমার কাছে অলওয়েজ ইয়াং।প্লিজ এইগুলা আর বলবেন নাহ।
বাবাই আমার মাথায় হাত রেখে বলেন,
-- আমি খুব খুশি তোমাকে ছেলের বউ করে পেয়ে। ইমন আমার বৌমাকে সবসময় হাসিখুশি রাখবি এটা তোর দায়িত্ব।
ইমন নিশ্চুপ ভাবে তার বাবার কথা শুনে। আমি বসা থেকে উঠে ইমনের পাশে গিয়ে দাড়ালে ও আমাকে ইশারা করে ওর সাথে যাওয়ার জন্য।
ও আমাকে ওর রুমে নিয়ে যায়। গিয়েই দেখি রুমের কি অবস্থা করে রেখেছে বিছানা এলোমেলো, বালিশ নিচে ফেলানো আরেকটা বালিশ বিছানার উপর কুকড়ানো বইগুলো এলো মেলোভাবে বিছানায় ছড়ানো ছিটানো। এক মূহূর্ত দেখেই আমার মাথা ঘুরানো শুরু করলো।
আমার দিকে তাকিয়ে ইমন বললো,
-- দাঁড়িয়ে না থেকে বসো।
-- কোথায় বসবো?
ইমন বিছানার চাদর টানতে লাগলো।
-- আচ্ছা আপনি কি বিছানার সাথে অলওয়েজ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেন?
ও ভ্রুকুচকে আমার দিকে তাকালো।
-- নাহ মানে বুঝি নাই।
-- এইরকম এলোমেলো রুমে কেউ থাকতে পারে? আর আপনি বাহিরেতো খুবই স্মার্ট এইরকম এলোমেলো রুম দেখলে সব মেয়েই পেছনের দরজা দিয়ে পলায়ন করবে।
হো হো করে হেসে উঠলো ইমন।
-- আচ্ছা তোমার কি এখন পালাতে ইচ্ছে হচ্ছে?
-- নাহ, আমার এই ঘর এখন গুছাতে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা আপনি আমাকে হেল্প করুন।
বইগুলো গুছিয়ে ইমনের হাতে ধরিয়ে দিলাম।
-- এই শোনেন এই বাজে অভ্যাসগুলো এইবার থেকে অফ রাখুন। এইগুলো স্টাডি রুমে রেখে আসুন।
হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো ও।
আমি ততক্ষনে পুরো রুম গুছিয়ে নিলাম।
-- এইরে তুমিতো দেখি খুব কাজের। কেমন তাড়াতাড়ি ঘর গুছিয়ে ফেললে। নাহ বাবাই একটা কাজের কাজ করেছে।
আমি ইমনের দিকে লজ্জাজনক ভঙ্গিতে তাকালাম।
-- আচ্ছা এতো লজ্জা পেতে হবেনা।
তোমার পড়াশোনার কি খবর?
পড়াশোনাতো সব আপনার চিন্তাই গোল্লায় গেছে। এটা আপনাকে বলি কেমনে?
-- কি হলো? কথা বলোনা কেন? তুমি এত নিশ্চুপ থাকো কেন?
কালকে থেকে আমি তোমাকে পড়াবো।
-- কিহ। এই নাহ..
-- নাহ মানে কি? আমি যা বলেছি তাই হবে। আর এটা আমার একটা দায়িত্ব। আমি কিন্তু খুব কড়া টিচার। পড়া না পাড়লে কঠিন শাস্তি দিবো।
-- কি শাস্তি দিবেন?
-- ওইটা পরিস্থিতি বুঝে।
ইমন বাবা ও ইমন বাবা ডাকতে ডাকতে ইমনদের বাসার বুয়া রহিমা খালা রুমের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
ইমন দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
-- খালা ভিতরে আসো।
-- নাহ আমি অহন ভিতরে যামু না, আফায় তোমাগো খাওতে ডাকছে। তাড়াতাড়ি আহো।
-- তুমি খেয়েছো?
-- হ খাইছি। আর পল্টু আর ওর বাপের লাইগ্যাও দিয়া দিছে।
-- আচ্ছা তুমি যাও। আমরা আসিছি।
-- আদি আসো খাওয়া দাওয়া করি খুব খুদা লাগছে।
আমি ইমনের পিছু পিছু নিচে গেলাম।
সবাই মিলে খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ করলাম।
এর মধ্যে ইমনের নানু বাড়ীর সবাই আসেন। সবার সাথেই পরিচয় করাই দিলো আমাকে।
বিকেল পর্যন্ত সবার সাথেই গল্প গুজব করা হলো।
এরপর সবাই মিলে এয়ারপোর্ট গেলাম। রাত নয়টার সময় মামনী আর বাবাই এর ফ্লাইট। খুব কষ্ট লাগছিলো ওনাদের জন্য। ইমনের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। বিদায় বেলায় বাবাই আমাকে আর ইমনকে ধরে কান্না শুরু করে দিলো। তারপর সবাই চোখ মুছে ওনাদের বিদায় দিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো ইমন আমার পাশে নেই। এতক্ষনতো এখানেই ছিলো। কিন্তু কোথায় গেল। আমি সবার ভীড় ঠেলে ইমনকে খুঁজতে লাগলাম।
ভাইয়া আমাকে চিল্লায় চিল্লায় ডাকতে থাকে,
-- আদৃতা কোথায় যাচ্ছিস?
আমি কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই হাটতে লাগলাম।
কিছুদুর যাওয়ার পর দেখি ইমন ওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনের দিক দেখেই বুঝে গেলাম এ আমার ইমন।
আমি ওর পিঠে হাত রাখলাম।
ইমন আমার দিকে ঘোরে তাকাতেই দেখলাম ওর নীল চোখে অশ্রু।
এই প্রথম আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না । ওকে তুমি করে বলেই ফেললাম,
-- ইমন, প্লিজ এইভাবে কেদো না। তুমি দেখো বাবা একদম সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। প্লিজ শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া কর। নিরাশ হইয়ো না।
আমি ওর দুই গালে দুই হাত দিয়ে টানতেছিলাম।
ইমন হঠাৎ ই আমাকে ওর দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার বাচ্চাদের মত কাঁদতে লাগলো।
চলবে...
লেখা আশিকা জামান
পার্ট ০৬
ইমন চলে যাবার পর বাসায় পৌছে ফোন করেছিলো। এরপর আর কথা হয়নি। আমি মাথা থেকে বিয়ের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে পড়াশোনায় মনযোগী হওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু একটু পর বুঝতে পারলাম আমার চেষ্টা ব্যার্থ। ইমন আমার মগজে ঢুকে গেছে এটাকে বের করা অসম্ভব।
পরেরদিন সকালে আমি ওকে ফোন করেছিলাম প্রথমে পিক করতে পারেনি। পরে ব্যাক করে বলেছিলো যে ও বিজি হস্পিটালে আছে পরে কথা বলবে। কিন্তু আমি সারাদিন অপেক্ষা করার পর রাতে ফোন করে বলে,
-- আদি আমি সারাদিন অনেক বিজি ছিলাম। এখন বলো কিছু বলবা?
-- নাহ, তেমন কিছু নাহ।
-- আচ্ছা তুমি পড়া শেষ করে ঘুমিয়ে যাও।আর কালকে সকাল সকাল এসো। রাখছি বাই।
আমি চুপ করে ছিলাম। কিছুই বলছিলাম নাহ। আমার সব কিছু উল্টাপাল্টা লাগছে। কেমন যেন একটা এভোয়েড এর গন্ধ আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে আলোড়িত করছে। কিন্তু আমি যে ভালবাসার মোহে অন্ধ। সবকিছুর উর্ধে থেকে যে আমি ইমনকেই ভালবাসি তাই আমি নিশ্চুপ।
-- কি হলো। কথা বলছোনা যে?
আমার কথা প্রছন্দ হয়নি। আমি সত্যিই ব্যাস্ত ছিলাম আর এখন খুব টায়ার্ড। একটা ফ্রেস ঘুম দরকার।
-- নাহ তেমন কিছু না। আপনি ঘুমান আর আমিও এখন ঘুমাবো কেমন।
আমি ফোনটা কেটে দিলাম।
সুক্ষ্ম অভিমান সারা রাত আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
সকালে মায়ের চিৎকারে আমার ঘুম ভাংগে। আমি কচলাতে কচলাতে চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকাই,
-- মা কি হয়েছে? আরেকটু ঘুমাতে দাও না।
-- এই উঠ। কোন কথা না।
বলেই মা আমার হাত ধরে টেনে তুলতে লাগলো।
-- তোর মনে নেই আজকে যে শ্বশুর বাড়ী যেতে হবে?
-- কার শ্বশুরবাড়ি, কিসের শ্বশুরবাড়ি? ধুর কি উল্টো পালটা বলছো আমারতো বিয়েই হয়নি।
ভাইয়া রুমের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলো আমার এই টাইপের কথা শুনে হাসতে হাসতে রুমে ঢুকে।
মা ও ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আবার হাসিতে ফেটে পড়ে।
ওদের হাসি আমার অসহ্য লাগছে। ধুর আমি কি এমন বলেছি যে এইভাবে হাসতে হবে।পরক্ষনেই মনে পড়ে গেল ছিঃ আমি এইটা কি বলমাম। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম।
-- ইমন যদি শুনে তুই দুইদিন যেতে না যেতেই ওকে এইভাবে ভুলে গেছিস তাহলেতো
বেচারা শেষ হয়ে যাবে।
এইটা বলে ভাইয়া আবার হাসতে লাগলো।
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
-- ওই বাড়ীতে গিয়ে আবার ভুলভাল কিছুই বলিস না। তাহলে আমরা লজ্জায় শেষ হয়ে যাবো।
আর শোন একেবারে রেডি হয়ে নিচে আসো। ব্রেকফাস্ট করেই বেরোবো ঠিক আছে। তোমার বাবা খুব আফসোস করে একদিনো তোমার সাথে ব্রেকফাস্ট করতে পারে না।
মা আর ভাইয়া চলে গেলে আমি আলমারি থেকে ড্রেস বের করতে লাগলাম। কিছুতেই প্রছন্দ করতে পারছিলাম। তারপর একটা হুয়াইট চিকেন জামা আর মেরুন চিকেন প্লাজো সাথে ব্ল্যাক কালারের ভিতর হুয়াইট, মেরুন, পার্পল কালার সুতোর কাজ করা ফুলকারী দোপাট্টা বের করলাম। এটা কেন জানি আজকে পড়তে ইচ্ছা হলো।
আমি একেবারে শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলাম। চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিলাম। কোমড় ছাড়ানো লম্বা চুলে কি স্টাইল করবো সেটাই বুঝতে পারছিলাম। আমার আবার কোন যায়গায় গেলে সবচেয়ে বেশি টাইম লাগে এই হেয়ার স্টাইল নিয়ে। পরে চুলগুলো সামনে থেকে নিয়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে পিছনের গুলো ছেড়ে দিলাম। হালকা কাজল আর লাইনার দিয়ে চোখ একে নিলাম। ঠোটে হালকা লিপিস্টিক দিয়ে নিচে নেমে এলাম।
মাকেও দেখলাম রেডি হয়ে আমার জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করছে। আমার কিছুতেই খেতে ইচ্ছে করছে না। কোন যায়গায় গেলে বরাবরের মতই আমার খেতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু মায়ের জোড়াজোড়িতে অনলি ডিম টা খেয়ে নিলাম।
ভাইয়া আর বাবা রেডি হয়ে আসলে সবাই আমাদের গাড়িতে বসে রওয়ানা হলাম।
আমাদের বাসা থেকে ওদের বাসায় আসতে বড়জোর কুড়ি মিনিটের মত লাগলো। দারোয়ান গেট খুলতেই সালাম দিয়ে ভেতরে যেতে বললো। নয় তলা বাসাটার লিফটে আমরা দোতলায় উঠলাম। ভাইয়া কলিং বেল চাপ দিতেই কিছুক্ষন পর ইমন এসে গেট খুলে দিলো। ও একটা মেরুন টি শার্ট আর অফ হুয়াইট প্যান্ট পড়েছে।
আমাদের দেখেই সালাম দিয়ে ভেতরে বসতে বললো। সামনেই ড্রইং রুম সবাই বসে পড়লো। মামনি আর বাবাই এসে সবার কুশল জিজ্ঞাস করলো। আসতে অসুবিধা হলো কিনা এটাও জিজ্ঞাস করলো। আমার ওদের বাসাটা ভালোই লাগলো।
ইমন আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-- আদি আসো তোমাকে বাসাটা ঘুরে দেখাই।
আমি ওর কথা শুনে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম।
মামনি এটা বুঝে ফেলে। আমার দিকে তাকিয়েই বলে,
-- যাও লজ্জা পেয়ো না । এটাতো তোমারই বাড়ী। আসলে তোমাকেতো এইভাবে আমি নিয়াসতে চাই নি। স্বপ্নটা অনেক বড় ছিলো আমার একমাত্র ছেলের বউ বলে কথা...
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
-- মামনি প্লিজ কষ্ট পাবেন না। আমি সত্যি হ্যাপি আপনাদের মত মা বাবা পেয়ে আমার আর কিচ্ছু চাই না।
মামনী এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
-- এইতো আমার লক্ষী মা। এবার তোমরা যাও আমরা বুড়ো বুড়িরা একটু নিজেদের মধ্যে কথা বলি।
-- উহু বুডু বুড়ী না আপনারা আমার কাছে অলওয়েজ ইয়াং।প্লিজ এইগুলা আর বলবেন নাহ।
বাবাই আমার মাথায় হাত রেখে বলেন,
-- আমি খুব খুশি তোমাকে ছেলের বউ করে পেয়ে। ইমন আমার বৌমাকে সবসময় হাসিখুশি রাখবি এটা তোর দায়িত্ব।
ইমন নিশ্চুপ ভাবে তার বাবার কথা শুনে। আমি বসা থেকে উঠে ইমনের পাশে গিয়ে দাড়ালে ও আমাকে ইশারা করে ওর সাথে যাওয়ার জন্য।
ও আমাকে ওর রুমে নিয়ে যায়। গিয়েই দেখি রুমের কি অবস্থা করে রেখেছে বিছানা এলোমেলো, বালিশ নিচে ফেলানো আরেকটা বালিশ বিছানার উপর কুকড়ানো বইগুলো এলো মেলোভাবে বিছানায় ছড়ানো ছিটানো। এক মূহূর্ত দেখেই আমার মাথা ঘুরানো শুরু করলো।
আমার দিকে তাকিয়ে ইমন বললো,
-- দাঁড়িয়ে না থেকে বসো।
-- কোথায় বসবো?
ইমন বিছানার চাদর টানতে লাগলো।
-- আচ্ছা আপনি কি বিছানার সাথে অলওয়েজ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেন?
ও ভ্রুকুচকে আমার দিকে তাকালো।
-- নাহ মানে বুঝি নাই।
-- এইরকম এলোমেলো রুমে কেউ থাকতে পারে? আর আপনি বাহিরেতো খুবই স্মার্ট এইরকম এলোমেলো রুম দেখলে সব মেয়েই পেছনের দরজা দিয়ে পলায়ন করবে।
হো হো করে হেসে উঠলো ইমন।
-- আচ্ছা তোমার কি এখন পালাতে ইচ্ছে হচ্ছে?
-- নাহ, আমার এই ঘর এখন গুছাতে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা আপনি আমাকে হেল্প করুন।
বইগুলো গুছিয়ে ইমনের হাতে ধরিয়ে দিলাম।
-- এই শোনেন এই বাজে অভ্যাসগুলো এইবার থেকে অফ রাখুন। এইগুলো স্টাডি রুমে রেখে আসুন।
হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো ও।
আমি ততক্ষনে পুরো রুম গুছিয়ে নিলাম।
-- এইরে তুমিতো দেখি খুব কাজের। কেমন তাড়াতাড়ি ঘর গুছিয়ে ফেললে। নাহ বাবাই একটা কাজের কাজ করেছে।
আমি ইমনের দিকে লজ্জাজনক ভঙ্গিতে তাকালাম।
-- আচ্ছা এতো লজ্জা পেতে হবেনা।
তোমার পড়াশোনার কি খবর?
পড়াশোনাতো সব আপনার চিন্তাই গোল্লায় গেছে। এটা আপনাকে বলি কেমনে?
-- কি হলো? কথা বলোনা কেন? তুমি এত নিশ্চুপ থাকো কেন?
কালকে থেকে আমি তোমাকে পড়াবো।
-- কিহ। এই নাহ..
-- নাহ মানে কি? আমি যা বলেছি তাই হবে। আর এটা আমার একটা দায়িত্ব। আমি কিন্তু খুব কড়া টিচার। পড়া না পাড়লে কঠিন শাস্তি দিবো।
-- কি শাস্তি দিবেন?
-- ওইটা পরিস্থিতি বুঝে।
ইমন বাবা ও ইমন বাবা ডাকতে ডাকতে ইমনদের বাসার বুয়া রহিমা খালা রুমের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
ইমন দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
-- খালা ভিতরে আসো।
-- নাহ আমি অহন ভিতরে যামু না, আফায় তোমাগো খাওতে ডাকছে। তাড়াতাড়ি আহো।
-- তুমি খেয়েছো?
-- হ খাইছি। আর পল্টু আর ওর বাপের লাইগ্যাও দিয়া দিছে।
-- আচ্ছা তুমি যাও। আমরা আসিছি।
-- আদি আসো খাওয়া দাওয়া করি খুব খুদা লাগছে।
আমি ইমনের পিছু পিছু নিচে গেলাম।
সবাই মিলে খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ করলাম।
এর মধ্যে ইমনের নানু বাড়ীর সবাই আসেন। সবার সাথেই পরিচয় করাই দিলো আমাকে।
বিকেল পর্যন্ত সবার সাথেই গল্প গুজব করা হলো।
এরপর সবাই মিলে এয়ারপোর্ট গেলাম। রাত নয়টার সময় মামনী আর বাবাই এর ফ্লাইট। খুব কষ্ট লাগছিলো ওনাদের জন্য। ইমনের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। বিদায় বেলায় বাবাই আমাকে আর ইমনকে ধরে কান্না শুরু করে দিলো। তারপর সবাই চোখ মুছে ওনাদের বিদায় দিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো ইমন আমার পাশে নেই। এতক্ষনতো এখানেই ছিলো। কিন্তু কোথায় গেল। আমি সবার ভীড় ঠেলে ইমনকে খুঁজতে লাগলাম।
ভাইয়া আমাকে চিল্লায় চিল্লায় ডাকতে থাকে,
-- আদৃতা কোথায় যাচ্ছিস?
আমি কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই হাটতে লাগলাম।
কিছুদুর যাওয়ার পর দেখি ইমন ওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনের দিক দেখেই বুঝে গেলাম এ আমার ইমন।
আমি ওর পিঠে হাত রাখলাম।
ইমন আমার দিকে ঘোরে তাকাতেই দেখলাম ওর নীল চোখে অশ্রু।
এই প্রথম আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না । ওকে তুমি করে বলেই ফেললাম,
-- ইমন, প্লিজ এইভাবে কেদো না। তুমি দেখো বাবা একদম সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। প্লিজ শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া কর। নিরাশ হইয়ো না।
আমি ওর দুই গালে দুই হাত দিয়ে টানতেছিলাম।
ইমন হঠাৎ ই আমাকে ওর দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার বাচ্চাদের মত কাঁদতে লাগলো।
চলবে...

No comments